নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিঃ একাল সেকাল
-আল্-মামুন সৈয়দ
সেকাল: পাট আর শ্রমিকের রাজনীতি-
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির শেকড় গাঁথা আছে শীতলক্ষ্যার পাড়ে। একসময় এই শহরের পরিচয় ছিল ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’। আদমজী জুটমিলের সাইরেনে দিন শুরু হতো, আর শ্রমিকের মিছিলেই ঠিক হতো রাজনীতির গতিপথ।
সত্তর-আশির দশকে এখানে রাজনীতি মানে ছিল ট্রেড ইউনিয়ন, পাটকল রক্ষার আন্দোলন, আর স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোর দাপট। দল যাই হোক, নিয়ন্ত্রণ থাকতো গোডাউন আর ঘাটের মালিকদের হাতে। নদী, ব্যবসা আর ক্ষমতা - এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের নিজস্ব ‘পলিটিক্যাল কালচার’।
একাল:
সিটি করপোরেশন থেকে জাতীয় নির্বাচনে
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি তিনটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
১. প্রশাসনিক রূপান্তর:
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে নতুন ইউনিয়ন যুক্ত হচ্ছে। শহর বড় হচ্ছে, সাথে বাড়ছে নাগরিক সমস্যা - জলাবদ্ধতা, শব্দ দূষণ, খেলার মাঠ দখল। এখন ভোট চাইতে হলে শুধু প্রতীক দেখালে চলে না, ড্রেনের পানি কোথায় যায় তার হিসাবও দিতে হয়।
২. জাতীয় প্রেক্ষাপটের ছায়া:
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতি বদলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে লড়ছেন ৪৮ জন প্রার্থী। জামায়াত জোটের ১২ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছিল, বিএনপি নতুন মুখ খুঁজেছে। আওয়ামী লীগ কার্যত মাঠের বাইরে। ফলে পুরোনো সমীকরণ ভেঙে নতুন জোট-মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল।
৩. অপরাধ ও আতঙ্কের রাজনীতি:
‘৭ খুন’, ‘নরঘাতককে নিয়ে ভয়’, ‘লুট হওয়া পিস্তল উদ্ধার’ - স্থানীয় সংবাদের শিরোনাম বলছে, সন্ত্রাস এখনও রাজনীতির অঘোষিত অংশীদার। দুই সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বে যখন ৭টি প্রাণ ঝরে, তখন বোঝা যায় প্রশাসনিক দুর্বলতা কতটা গভীরে।
সেতুবন্ধনটা কোথায়?
সেকালের নারায়ণগঞ্জ চলতো পাটের টাকায়, একালের নারায়ণগঞ্জ চলে জমির দাম, পরিবহন চাঁদা আর রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের টাকায়। আগে ছিল মিল-কারখানা কেন্দ্রিক শ্রমিক রাজনীতি, এখন আছে ওয়ার্ড-কেন্দ্রিক কাউন্সিলর রাজনীতি। কিন্তু মিল একটাই: জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনও কম।
সময়োপযোগী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
১. ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি:
জ্বালানি তেল জব্দ বা মাদক কারবারি গ্রেপ্তারের খবর নয়, মানুষ চায় জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, শিশুর নিরাপত্তা। দলগুলোকে ‘উন্নয়ন’ বক্তৃতা থেকে নেমে ওয়ার্ডের ড্রেনের নকশা নিয়ে কথা বলতে হবে।
২. স্বচ্ছতা:
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৯ জন এমপি হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। মনোনয়ন বাণিজ্য আর প্রার্থিতা বাতিলের খেলা বন্ধ করে ভোটের মাঠে আসল প্রতিযোগিতা দরকার।
৩. তরুণ নেতৃত্ব:
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ এর বাছাই হচ্ছে, কিন্তু রাজনীতির বাছাইয়ে তরুণরা কোথায়? ফারজানা সিঁথিদের মতো ‘জুলাইয়ের অগ্নিকন্যা’রা মনোনয়ন না পেলে রাজনীতি বদলাবে কী করে?
শেষ কথাঃ
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি কখনোই শুধু নারায়ণগঞ্জের ছিল না। এটা ছিল জাতীয় রাজনীতির ল্যাবরেটরি। পাটকলের আগুন থেকে শুরু করে সাত খুন ও মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যার বিচার - সবই ঢাকার ক্ষমতার মসনদে ঢেউ তুলেছে।
একালের চ্যালেঞ্জ হলো সেকালের ‘মাস্তান-নির্ভর’ ইমেজ ভেঙে ‘নাগরিক-নির্ভর’ রাজনীতি গড়া। সিটি করপোরেশন বড় হচ্ছে, কিন্তু নাগরিক সুবিধা ছোট হলে লাভ কী? নির্বাচন আসছে, কিন্তু ভোটের অধিকার নিশ্চিত না হলে উৎসব কীসের?
সময় বদলেছে। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিকেও বদলাতে হবে। কারণ শীতলক্ষ্যা বহমান, কিন্তু তার পাড়ের মানুষ আর বোবা দর্শক হয়ে থাকতে রাজি নয়।