

শীতলক্ষ্যার পাড়ে এক রাজবাড়ির গল্প
—আল্-মামুন সৈয়দ
বর্ষার বিকেলে শীতলক্ষ্যার ঘাটে দাঁড়ালে আজও বাতাসে পাটের গন্ধ পাওয়া যায়। মাঝিরা বলে, এই নদী সব দেখেছে। আদমজীর সাইরেন, লঞ্চের ভেঁপু, মিছিলের শ্লোগান, আর রাতের আঁধারে ভেসে যাওয়া লাশের নীরব সাক্ষীও সে।
এই নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছিল এক ‘রাজবাড়ি’। ইট-পাথরের প্রাসাদ নয়, ক্ষমতার অদৃশ্য প্রাসাদ। লোকে বলতো ‘ওসমান বাড়ি’।
স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জ মানে পাট, পাট মানে টাকা, টাকা মানে ক্ষমতা। তিন ভাই – নাসিম, শামীম, সেলিম। ঘাট ইজারা থেকে শুরু। তারপর ট্রাক স্ট্যান্ড, বালুর মহাল, ফতুল্লার সিএনজি রুট। ব্যবসা বাড়লো, সাথে বাড়লো লোক। লোক বাড়লে দরকার হয় ‘আশ্রয়’। আর আশ্রয় দিতে দিতেই একসময় ‘আশ্রয়দাতা’ হয়ে উঠলেন ‘নিয়ন্ত্রক’।
নব্বইয়ের দশকে দল যখন রাস্তায়, তখন ওসমান বাড়ির গেট খোলা। মামলা-হামলায় পড়া কর্মীর শেষ ঠিকানা। ২০০১ সালে দল ক্ষমতা হারালো, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ হারালো না। বিরোধী দলের এমপি না হয়েও নাসিম ওসমানের গাড়ির সামনে পুলিশ স্যালুট ঠুকতো। মানুষ বলতো, “নদীর এক পাড়ে সরকার, অন্য পাড়ে ওসমান।”
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলো। শামীম ওসমান এমপি না হলেও শহরের দেয়ালে দেয়ালে নতুন গ্রাফিতি শোভা পায়– ‘খেলা হবে’।
খেলা আসলেই হলো। সিটি করপোরেশন হলো। রাস্তা হলো, ফ্লাইওভার হলো, আলো জ্বললো। আবার রাতও হলো। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। সাতটি লাশ ভেসে উঠলো শীতলক্ষ্যায়। প্যানেল মেয়র নজরুল, আইনজীবী চন্দন সরকার সহ সাতজন। পুরো দেশ কেঁপে উঠলো।
কোর্ট বললো, র্যাব করেছে। র্যাব বললো, আদেশ এসেছিল উপর থেকে। ‘উপর’টা কে? নারায়ণগঞ্জের বাতাসে ফিসফাস, চায়ের দোকানে গুঞ্জন, ফেসবুকের পোস্ট। কিন্তু এজাহারে নাম নেই। প্রমাণ নেই। আছে শুধু আতঙ্ক।
এরপর টেন্ডার। ১০ কোটির কাজ, ১১ জন শিডিউল কিনলো, বক্সে পড়লো ১টা। বাকিরা হাসপাতালে, নয়তো জেলখানায়। ঠিকাদাররা বলতো, “টাকা দিয়া কাজ পাই না, দোয়া লাগে।”
মিছিল করতে গেলে লাঠি চার্জ হয়, মামলা করতে গেলে থানা বলে, ‘উপরের নিষেধ’। ইউএনও বদলি হয় সন্ধ্যায়, ওসি বদলি হয় দুপুরে। ফাইলে লেখা থাকে ‘জনস্বার্থে’, শহরবাসী পড়ে ‘ভাইয়ের স্বার্থে’।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় ছাত্ররা নামলো, নারায়ণগঞ্জে নামলো গার্মেন্টস কর্মী। চাষাড়া মোড়ে গুলি চললো। এবার আর ‘বড় ভাই’ বাঁচাতে এলেন না। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন।
৬ আগস্ট সকালে ওসমান বাড়ির গেট বন্ধ। সিসি ক্যামেরা ভাঙা। লোকে এসে সেলফি তোলে। দেয়ালে নতুন গ্রাফিতি – ‘রাজা নাই, রাজত্বও নাই’।
শামীম ওসমান নেই, সেলিম ওসমান নেই। তৃণমূলের কর্মীরা কোর্টে হাজিরা দেয়। কেউ জেলে, কেউ পালিয়ে বেড়ায় দেশ-বিদেশে।
শীতলক্ষ্যা যদি কথা বলতে পারতো, সে বলতো-“আমি রাজা দেখেছি, প্রজাও দেখেছি। আমি সাইরেন শুনেছি, কান্নাও শুনেছি। যারা ভেবেছিল আমি শুধু লাশ লুকাই, তারা ভুলে গিয়েছিল আমি স্রোতও বই। স্রোত একদিন সব ভাসিয়ে নেয়। পাটের গদি ভেসেছে, টেন্ডারের কাগজ ভাসবে, ক্ষমতার দম্ভও ভাসবে।”
২০২৬ সালে নারায়ণগঞ্জেও নির্বাচন হলো। ওসমান পরিবারের কেউ প্রার্থী হলো না। রাস্তায় মাইক বাজে, “ভয়কে না বলুন”।
কিন্তু চায়ের দোকানে বৃদ্ধ মাঝি আজও ফিসফিস করে, “ভাই, রাজবাড়ি খালি পড়ে থাকে না। এক রাজা যায়, আরেক রাজা আসে। আসল কথা হইলো, আমরা প্রজা কবে মানুষ হমু?”
জলাবদ্ধতা এখনও হয়। মাঠ এখনও দখল হয়। থানায় এখনও তদবির চলে। শুধু ফোনের ওপাশে কণ্ঠটা পাল্টে গেছে।
তাই গল্পটা শুধু ওসমান পরিবারের না। গল্পটা একটা শহরের, যে শহর বারবার প্রভু বদলায়, কিন্তু স্বাধীন হয় না। যে শহরের নদী সব জানে, কিন্তু সাক্ষী দেয় না। যে শহরের মানুষ দেয়ালে লেখে ‘খেলা হবে’, কিন্তু খেলার নিয়ম কখনো নিজে লিখতে পারে না।
শীতলক্ষ্যা বয়ে চলে। সে অপেক্ষায় থাকে – কবে এই শহর ‘রাজবাড়ি’ নয়, ‘নাগরিক বাড়ি’ হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত লিখুন :